আমাশয় হলে করণীয় কী? লক্ষণ, কারণ, ঔষধ ও বাচ্চাদের জন্য বিশেষ পরামর্শ

Dysentery

আমাশয় রোগ নিয়ে অনেকেরই অভিজ্ঞতা আছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে বর্ষাকাল এলে বা রাস্তার খাবার খেলে এই সমস্যাটা খুব সহজেই চলে আসে। আমি নিজেও দেখেছি, পরিবারের অনেকে এতে ভুগেছে। তাই আজকে সোজাসাপটা কথায় আমাশয় নিয়ে বিস্তারিত বলব—কেন হয়, কী লক্ষণ দেখা যায়, হলে কী করতে হবে, ঘরে কী করা যায়, কোন খাবার খাওয়া উচিত আর কোন ওষুধ সাধারণত দেয়া হয়। সবকিছু মিলিয়ে একটা পুরো ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আমাশয় কেন হয়? রক্ত আমাশয়ের কারণ কী?

আমাশয় মূলত অন্ত্রের সংক্রমণ থেকে শুরু হয়। দুই রকম হতে পারে—একটা পরজীবী (অ্যামিবা) দিয়ে, আরেকটা ব্যাকটেরিয়া (শিগেলা জাতীয়) দিয়ে। দূষিত পানি, অপরিষ্কার খাবার, ফল-সবজি না ধুয়ে খাওয়া বা হাত না ধুয়ে খাবার খেলেই এটা ছড়ায়। অনেক সময় রাস্তার খাবার বা বাইরের দোকানের খাবার থেকেও হয়।

রক্ত আমাশয় হলে ব্যাপারটা আরেকটু গুরুতর। অন্ত্রের ভিতরের দেয়ালে ক্ষত তৈরি হয়, ফলে পায়খানার সাথে রক্ত বের হয়। দুর্বল শরীর, কৃমির সমস্যা বা দীর্ঘদিন অপুষ্টি থাকলে এটা সহজে হয়ে যায়। পুরাতন আমাশয় হলে অন্ত্রের প্রদাহ অনেকদিন থেকে যায়, যা পরে অন্য সমস্যা ডেকে আনে।

আমাশয় রোগের লক্ষণগুলো কেমন?

লক্ষণ দেখলে বোঝা যায় কতটা সিরিয়াস। সাধারণত:

  • দিনে কয়েকবার পাতলা পায়খানা, অনেক সময় রক্ত বা শ্লেষ্মা মেশানো
  • পেটে তীব্র ব্যথা বা ক্র্যাম্প
  • জ্বর, বমি ভাব, খাবারে একদম অরুচি
  • শরীর দুর্বল লাগা, ওজন কমে যাওয়া

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা আরও দ্রুত খারাপ হয়। পানিশূন্যতা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হতে হয়।

আমাশয় হলে করণীয় কী?

প্রথম কাজ—বিশ্রাম নেয়া এবং শরীরে পানি ধরে রাখা। ওআরএস স্যালাইন খাওয়া খুব জরুরি। ডাক্তার না দেখিয়ে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া ঠিক না। হাত ভালো করে ধোয়া, ফুটানো পানি খাওয়া, খাবার ঢেকে রাখা—এগুলো করলে নতুন করে আর হবে না।

ঘরোয়া চিকিৎসা কী কাজে লাগে?

পুরাতন আমাশয় রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা অনেকে করে দেখেছে। থানকুনি পাতা ধুয়ে রস বের করে খেলে অনেকের পেট শান্ত হয়। দই ভালো, কারণ এতে ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে। কলা, সেদ্ধ ভাত বা আলু দিয়ে শুরু করা যায়। আদা চা বা জিরা-আদা মিশিয়ে পানি খেলে পেটের ব্যথা কমে।

বাচ্চাদের আমাশয় রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা আরও সাবধানে করতে হয়। শিশুকে দই-ভাত, কলা, সেদ্ধ আলু দিন। থানকুনি সিদ্ধ করে ছেঁকে অল্প অল্প করে খাওয়ানো যায়, তবে ডাক্তারের সাথে কথা বলে। বাচ্চাদের ডিহাইড্রেশন খুব তাড়াতাড়ি হয়, তাই লক্ষণ না কমলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান।

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা কেমন হওয়া উচিত?

খাবার হালকা এবং সহজপাচ্য রাখুন। রক্ত আমাশয় হলে কি খাওয়া উচিত? মূলত:

  • পাকা কলা (পটাশিয়াম পায় শরীর)
  • সাদা ভাত বা খিচুড়ি
  • সেদ্ধ আলু, টোস্ট বিস্কুট
  • দই (প্রোবায়োটিকের জন্য)
  • চর্বিহীন মুরগির ঝোল
  • ডাবের পানি, লেবু-মধু মিশিয়ে পানি

তেল-মশলা, কাঁচা সবজি, দুধ (কারও কারও ক্ষেত্রে), ফাস্টফুড, চা-কফি একদম বাদ দিন। BRAT ডায়েট (কলা, ভাত, আপেলের সস বা টোস্ট) অনেকের কাজে লাগে। ছোট ছোট করে বারবার খান, একসাথে বেশি খাবেন না।

আমাশয় রোগের ঔষধ কোনগুলো?

আমাশয় রোগের ঔষধ ধরন অনুযায়ী দেয়া হয়। অ্যামিবিক হলে মেট্রোনিডাজল (ফ্ল্যাজিল, অ্যামোডিস), সেকনিডাজল জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়। রক্ত আমাশয় রোগের ঔষধের নাম বাংলাদেশে সাধারণত সেকনিডাজল, মেট্রোনিডাজল বা প্রয়োজনে সিপ্রোফ্লক্সাসিন। ব্যাকটেরিয়াল হলে এন্টিবায়োটিক লাগে।

বাচ্চাদের আমাশয় ঔষধ নাম—বয়স ও ওজন দেখে সিরাপ আকারে মেট্রোনিডাজল বা অন্যান্য। পুরাতন আমাশয় রোগের এলোপ্যাথিক ঔষধের নামে অনেক সময় প্রোবায়োটিক (যেমন এন্ট্রোফ্লোরা) যোগ করা হয়। তবে আমাশয় রোগের ঔষধ কোনটি—এটা একদম ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। স্ব-চিকিৎসা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

শেষ কথা

আমাশয় সাধারণ মনে হলেও অবহেলা করলে অনেক ঝামেলা হতে পারে। লক্ষণ দেখা দিলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসা নিন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলুন আর স্বাস্থ্যকর খাবার খান। ঘরোয়া উপায়গুলো সাহায্য করতে পারে, কিন্তু গুরুতর হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো। সবাই সুস্থ থাকুন, এই ধরনের সমস্যা থেকে দূরে থাকুন।

Leave a Comment

Scroll to Top